বুকেলের পথেই কোস্টারিকা, অপরাধ দমনে কেন মেগা-কারাগার চালু করা হলো?
লাতিন আমেরিকাজুড়ে অপরাধ দমনে কঠোর নীতির এক নতুন প্রবণতা ছড়িয়ে পড়ছে। ভয়াবহ সহিংসতা, মাদক পাচার ও সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের দৌরাত্ম্য মোকাবিলায় দেশগুলো ক্রমেই ঝুঁকছে বিশাল কারাগার নির্মাণ এবং কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থার দিকে। বিশেষ করে এল সালভাদরের প্রেসিডেন্ট নায়েব বুকেলের বিতর্কিত অথচ জনপ্রিয় অপরাধ দমননীতি এখন এই অঞ্চলের একাধিক দেশের কাছে অনুসরণীয় মডেল হয়ে উঠেছে।
এমন পরিস্থিতিতে ক্রমবর্ধমান হত্যাকাণ্ড ও সংঘবদ্ধ অপরাধের লাগাম টানতে নতুন একটি মেগা-কারাগার উদ্বোধন করেছে মধ্য আমেরিকার দেশ কোস্টারিকা। দেশটির এই পদক্ষেপকে অপরাধ দমনে বুকেলের কঠোর নীতির অনুসরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে অপরাধীদের বিরুদ্ধে এমন কঠোর অবস্থান নাগরিক স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের জন্য কতটা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, তা নিয়েও শুরু হয়েছে বিতর্ক।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) কোস্টারিকার প্রেসিডেন্ট লরা ফার্নান্দেজ ‘হাই-সিকিউরিটি সেন্টার অ্যাগেইনস্ট অর্গানাইজড ক্রাইম’ বা সংগঠিত অপরাধ দমনে উচ্চ নিরাপত্তার কেন্দ্র (ক্যাকো) উদ্বোধন করেন। বিশাল এই কারাগারে একসঙ্গে ৫ হাজার ১০০ বন্দি রাখা যাবে, যা দেশটির বর্তমান কারাবন্দির সংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশের সমান।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়ে ফার্নান্দেজ বলেন, ‘ক্যাকো অপরাধীদের এমন একটি নতুন ব্যবস্থার মুখোমুখি করবে, যা অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেবে। কারাগারের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোস্টারিকা একটি বৈশ্বিক মানদণ্ড হয়ে উঠবে।’
কোস্টারিকার এই সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে দেশটির ক্রমাবনতিশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতি। একসময় প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অপেক্ষাকৃত শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ হিসেবে পরিচিত কোস্টারিকা এখন সংঘবদ্ধ অপরাধ ও হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে।
১৪ অক্টোবর, ২০২৬ তারিখে কোস্টা রিকার আলাহুয়েলায় সংগঠিত অপরাধের বিরুদ্ধে উচ্চ-সুরক্ষিত কেন্দ্র (CACCO)-এর উদ্বোধনকালে কোস্টা রিকার রাষ্ট্রপতি লরা ফার্নান্দেজ বক্তব্য রাখছেন। ছবি: রয়টার্স ২০২৩ সালে দেশটিতে রেকর্ড ৯০৫টি হত্যাকাণ্ড ঘটে। পরের বছর ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৮৭৬ এবং ২০২৫ সালে ৮৭৩। টানা তিন বছর ধরে হত্যাকাণ্ডের এমন উচ্চ সংখ্যা দেশটির আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সহিংসতার অন্যতম কারণ লাভজনক আন্তর্জাতিক মাদক পাচারের পথগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ক্রমবর্ধমান সংঘাত। মাদকের ব্যবসা ও পাচারের গুরুত্বপূর্ণ পথগুলোর দখল নিতে প্রতিদ্বন্দ্বী চক্রগুলোর সংঘর্ষ দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
এই পরিস্থিতিতে অপরাধী চক্রগুলোর প্রভাব কমানো এবং কারাগার ব্যবস্থার ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করতেই নতুন মেগা-কারাগার নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে কোস্টারিকা সরকার।
দেশটির আইনমন্ত্রী গ্যাব্রিয়েল আগুইলার জানিয়েছেন, নতুন এই স্থাপনা কারাগার ব্যবস্থার ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং সংগঠিত অপরাধী চক্রের অনুপ্রবেশ কমাতে সহায়তা করবে।
কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা অনুযায়ী, অক্টোবরের শেষ দিকে নতুন কারাগারটিতে প্রথম বন্দিদের স্থানান্তর শুরু হবে।
তবে কোস্টারিকার এই উদ্যোগ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে এল সালভাদরের প্রেসিডেন্ট নায়েব বুকেলের কঠোর নিরাপত্তানীতি ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
২০২২ সালে বুকেলে সরকার দেশটিতে ‘ব্যতিক্রমী অবস্থা’ বা বিশেষ জরুরি অবস্থা জারি করে। এর মাধ্যমে পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা ব্যাপকভাবে বাড়ানো হয়। শুরু হয় অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন অভিযান, গণগ্রেপ্তার এবং কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা কার্যকরের প্রক্রিয়া।
বুকেলে প্রশাসনের দাবি, এসব পদক্ষেপের ফলে এল সালভাদরে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমেছে। অপরাধ দমনে এই সাফল্যের প্রচার তাঁকে নিজ দেশে ব্যাপক জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছে।
তবে এই কঠোর নীতির বিপরীত চিত্রও রয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, জরুরি অবস্থার সুযোগে দেশটিতে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন ঘটেছে। এমনকি সরকারের সমালোচকদের বিরুদ্ধেও এই ব্যবস্থাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
এরপরও বুকেলের মেগা-কারাগার মডেল লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক নেতাদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
জুলাইয়ে দায়িত্ব নেওয়া পেরুর প্রেসিডেন্ট কেইকো ফুজিমোরি নিজ দেশে একই ধরনের কারাগার নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে এল সালভাদরের আলোচিত সন্ত্রাসবাদ বন্দিশিবির সিইসিওটি (CECOT) পরিদর্শনের ঘোষণা দিয়েছেন। বিশাল এই কারাগারের ধারণক্ষমতা প্রায় ৪০ হাজার বন্দি।
বুকেলের মেগা-কারাগারের আদলে নির্মিত কোস্টারিকার কারাগার। ছবি: সংগৃহীত অন্যদিকে কলম্বিয়ার নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েল্লা নির্বাচনী প্রচারণায় দেশজুড়ে ১০টি মেগা-কারাগার নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। আগস্টে দায়িত্ব গ্রহণের পর তাঁর এই পরিকল্পনা নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম দেশ ব্রাজিলেও মেগা-কারাগার নির্মাণের বিষয়টি নির্বাচনী রাজনীতিতে গুরুত্ব পাচ্ছে। দেশটির চলমান প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের চূড়ান্ত পর্বে পৌঁছানো ডানপন্থী সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারো এল সালভাদরের মডেল অনুসরণ করে পাঁচটি বিশাল কারাগার নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
এভাবে অপরাধ দমনে বুকেলের কঠোর নীতি লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিকভাবে প্রভাব বিস্তার করছে। তবে এর কার্যকারিতা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি নিয়ে বিতর্কও ক্রমেই তীব্র হচ্ছে।
এল সালভাদরে ২০২২ সালে জারি করা জরুরি অবস্থার আওতায় হাজার হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই সঙ্গে গণবিচারের মাধ্যমে একবারে শত শত আসামির বিচার করার ঘটনাও ঘটেছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে যথাযথ বিচারপ্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। এমনকি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ছাড়াই কিছু ব্যক্তিকে দীর্ঘ সময় আটকে রাখা হয়েছে।
বুকেলে প্রশাসন অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে নিজেদের সাফল্য তুলে ধরলেও প্রথমবার জারি করার পর থেকে জরুরি অবস্থার মেয়াদ ধারাবাহিকভাবে বাড়ানো হচ্ছে।
বিশেষ করে এল সালভাদরের সিইসিওটি কারাগার ঘিরে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। সমালোচকদের দাবি, সেখানে বন্দিদের অতিরিক্ত ভিড়, কঠোর নিয়ন্ত্রণ, যথাযথ বিচারপ্রক্রিয়া থেকে বঞ্চিত করা এবং নির্যাতনের মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো সতর্ক করে বলেছে, অপরাধ দমনের নামে এ ধরনের কঠোর ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে নাগরিক স্বাধীনতা ও আইনের শাসনের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে কঠোর নিরাপত্তানীতির সমর্থকদের যুক্তি, সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলায় প্রচলিত ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
কোস্টারিকার নতুন মেগা-কারাগার উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে লাতিন আমেরিকায় এই বিতর্ক আরও সামনে এসেছে। একদিকে হত্যাকাণ্ড ও মাদক অপরাধের বিস্তার ঠেকাতে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থার দাবি, অন্যদিকে নাগরিক অধিকার ও মানবিক বিচারব্যবস্থা রক্ষার প্রয়োজনীয়তা।
ফলে কোস্টারিকার সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো, বুকেলের মডেল অনুসরণ করে সংঘবদ্ধ অপরাধ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নাগরিক স্বাধীনতা ও মানবাধিকার কতটা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
সূত্র: আল জাজিরা-রয়টার্সসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্যের আলোকে বিশ্লেষণ
The post বুকেলের পথেই কোস্টারিকা, অপরাধ দমনে কেন মেগা-কারাগার চালু করা হলো? appeared first on Citizens Voice .
The full article is being collected. Available text is shown for now.